একটি ভবঘুরে ছেলে এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রথম ধাপ: ম্যাককালোচ-পিটস নিউরন
কিভাবে গড়ে উঠলো আধুনিক ডিপ লার্নিংয়ের মূল ভিত্তি

আর্টিফিশিয়াল নিউরাল নেটওয়ার্ক বা ANN-এর যাত্রার শুরুটা হয়েছিল একটি প্রশ্ন থেকে: “আমরা কি মানুষের মস্তিষ্কের একটি গাণিতিক মডেল (Mathematical Model) তৈরি করতে পারি?”
১৯৪৩ সালে ওয়ারেন ম্যাককালোচ এবং ওয়াল্টার পিটস একটি ঐতিহাসিক পেপার প্রকাশ করেন, যার নাম ছিল "A Logical Calculus of the Ideas Immanent in Nervous Activity"। এই গবেষণাপত্রে তাঁরা মূলত বুঝতে চেয়েছিলেন, কীভাবে মস্তিষ্কের অসংখ্য সাধারণ কোষ বা নিউরন একে অপরের সাথে যুক্ত হয়ে অত্যন্ত জটিল সব চিন্তাভাবনা বা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। আর এটি ব্যাখ্যা করতেই তাঁরা নিউরনের একটি অত্যন্ত সরলীকৃত মডেল (Simplified Model) উপস্থাপন করেন। এটি ছিল ইতিহাসের প্রথম ফর্মাল মডেল যা মস্তিষ্কের বায়োলজিক্যাল মেকানিজমের সাথে লজিক বা গাণিতিক যুক্তির এক সেতুবন্ধন তৈরি করতে চেয়েছিল। এই পেপারটির কালজয়ী অবদান কিন্তু এর বায়োলজিক্যালি নিখুঁত হওয়ার মধ্যে ছিল না (কারণ আজ আমরা জানি যে সেই মডেলটিতে অনেক সীমাবদ্ধতা ছিল)। বরং এর মাহাত্ম্য ছিল সেই বৈপ্লবিক চিন্তাধারায়—এমন এক যুগে যখন বায়োলজি আর গণিত ছিল সম্পূর্ণ আলাদা জগত, তখন তাঁরাই প্রথম সাহস করে বলেছিলেন যে মানুষের চিন্তার জগতকেও গাণিতিক সমীকরণ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায়। যদিও সেই সময়ে নিউরোসায়েন্স কমিউনিটি এটিকে প্রায় পুরোপুরি উপেক্ষা করেছিল, কিন্তু বর্তমানে এই আর্টিকেলটির সাইটেশন সংখ্যা প্রায় ৩০,০০০।
এক অদ্ভুত জুটি
এই গল্পের শুরুটা জানতে হলে আমাদের ফিরে যেতে হবে বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে, যখন কম্পিউটার সায়েন্স আজকের মতো এত উন্নত ছিল না।
এই যাত্রার নায়ক ছিলেন দুইজন ভিন্ন জগতের মানুষ:
১. ওয়ারেন ম্যাককালোচ (Warren McCulloch): একজন নিউরোফিজিওলজিস্ট (Neurophysiologist), যিনি মানুষের মস্তিষ্কের গঠন নিয়ে কাজ করতেন।
২. ওয়াল্টার পিটস (Walter Pitts): একজন তরুণ গণিতবিদ বা ম্যাথমেটিশিয়ান।
এই গল্পের সবচেয়ে আকর্ষণীয় চরিত্র হলেন ওয়াল্টার পিটস। তাঁর জীবনটা ছিল সিনেমার গল্পের মতো রোমাঞ্চকর। পিটস প্রাতিষ্ঠানিকভাবে হাইস্কুলের গণ্ডিও পার করতে পারেননি। তাঁর বাবা চাইতেন ছেলে পড়াশোনা বাদ দিয়ে কাজে ঢুকে পড়ুক এবং টাকা রোজগার করুক। একদিকে বাবার চাপ, আর অন্যদিকে স্কুলে বুলিং: এসবের হাত থেকে বাঁচতে তিনি একবার লাইব্রেরিতে লুকিয়ে ছিলেন। সেখানে তাঁর হাতে আসে বার্ট্রান্ড রাসেলের বিখ্যাত এবং অত্যন্ত জটিল বই Principia Mathematica। মাত্র ১২ বছর বয়সে তিনি সেই বই পড়ে তাতে ভুল খুঁজে বের করেন এবং খোদ রাসেলকে চিঠি লেখেন! শেষমেশ ১৫ বছর বয়সে তিনি বাড়ি থেকে পালিয়ে ইউনিভার্সিটি অফ শিকাগোতে চলে যান, শুধুমাত্র রাসেলের লেকচার শোনার জন্য।
ইউনিভার্সিটি অফ শিকাগোতেই ম্যাককালোচ এর সাথে তার দেখা। ম্যাককালোচ তখন ৪২ বছরের প্রতিষ্ঠিত বিজ্ঞানী, আর পিটস ১৮ বছরের এক ছন্নছাড়া তরুণ যার থাকার কোনো জায়গা ছিল না। ম্যাককালোচ এই তরুণ প্রতিভাকে চিনতে ভুল করেননি; তিনি পিটসকে নিজের বাড়িতে থাকার আমন্ত্রণ জানান। আর সেখানেই, আড্ডার ফাঁকে ফাঁকে এই ভবঘুরে তরুণ আর অভিজ্ঞ বিজ্ঞানীর হাত ধরে বপন করা হয় আজকের নিউরাল নেটওয়ার্কের বীজ।
বায়োলজি বনাম গণিত
১৯৪০-এর দশকে জীববিজ্ঞান আর গণিত ছিল সম্পূর্ণ আলাদা দুটো জগত।
একদিকে নিউরোসায়েন্স: যা বায়োলজিক্যাল, ভীষণ জটিল এবং অগোছালো।
অন্যদিকে ফর্মাল লজিক (Formal Logic): যা অত্যন্ত গোছানো, সুনির্দিষ্ট এবং শুধুই হিসেব-নিকেশের খেলা।
আপাতদৃষ্টিতে মনে হতো, এই দুই মেরুর মধ্যে কোনো মিলন সম্ভব নয়। কিন্তু ম্যাককালোচ এবং পিটস জানতেন, এই অসাধ্য সাধন করতে হলে প্রথমেই দরকার “সরলীকরণ” বা Simplification। তাঁরা সিদ্ধান্ত নিলেন, নিউরনের সব জটিল ও অগোছালো বায়োলজিক্যাল ডিটেইলস বাদ দিয়ে শুধুমাত্র এর মৌলিক বৈশিষ্ট্য বা ফান্ডামেন্টালস (Fundamentals)-এর ওপর ফোকাস করবেন।
বায়োলজি থেকে গণিতে রূপান্তর
আর এই চিন্তাধারা থেকেই, মডেলটি তৈরি করার আগে তাঁরা ১৯৪০-এর দশকের নিউরোসায়েন্সের জানা বিষয়গুলোকে একত্রিত করলেন। সে সময়ের জীববিজ্ঞান অনুযায়ী একটি নিউরনের গঠন এবং কাজের প্রবাহ ছিল অনেকটা এমন:

১. ডেনড্রাইট (Dendrites): এগুলো হলো নিউরনের ইনপুট রিসিভার। গাছের ডালপালার মতো এই অংশটি অন্য নিউরন থেকে সিগন্যাল বা তথ্য গ্রহণ করে।
২. সোমা (Soma): নিউরনের মূল বডি (neuron cell body)। ডেনড্রাইট দিয়ে আসা সব সিগন্যাল এখানে এসেই জমা হয়।
৩. অ্যাক্সন (Axon): এটি নিউরনের ট্রান্সমিটার বা আউটপুট চ্যানেল। সোমা থেকে প্রক্রিয়াজাত (Processed) সিগন্যাল এই লম্বা লেজ বা তারের মাধ্যমেই সামনে এগিয়ে যায়।
৪. সিন্যাপস (Synapse): এটি দুটি নিউরনের সংযোগস্থল। এক নিউরনের অ্যাক্সন যেখানে অন্য নিউরনের ডেনড্রাইটের সাথে মিলিত হয়, সেই জংশন পয়েন্টকে সিন্যাপস বলে। এই সংযোগের মাধ্যমেই সিগন্যাল এক নিউরন থেকে অন্য নিউরনে পরিবাহিত হয়।
এই সিন্যাপস দিয়ে আসা সিগন্যাল মূলত দুই ধরণের হতে পারে:
Excitatory (উত্তেজনাকর): যা নিউরনকে 'ফায়ার' করতে উৎসাহিত করে।
Inhibitory (নিরুৎসাহী): যা নিউরনকে ফায়ার করা থেকে বিরত রাখতে চায় বা থামিয়ে দেয়।
তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো ‘থ্রেশোল্ড’ (Threshold)।
একটি নিউরন কিন্তু চাইলেই হুট করে সিগন্যাল পাঠায় না। সোমা-তে জমা হওয়া সিগন্যাল বা উত্তেজনার পরিমাণ যদি একটি নির্দিষ্ট সীমা বা Threshold অতিক্রম করে, কেবল তখনই নিউরনটি ‘ফায়ার’ করে বা অ্যাক্সন দিয়ে আউটপুট পাঠায়। আর যদি উদ্দীপনা সেই সীমার কম হয়? তাহলে কোনো আউটপুট নেই। নিউরনের কাজের এই ধরণটিকেই বলা হয় “All-or-none” ক্যারেক্টার। হয় পূর্ণ সিগন্যাল যাবে, নয়তো কিছুই যাবে না।
সে সময়ে ইনহিবিটরি সিগন্যাল ঠিক কীভাবে কাজ করে তা নিয়ে নিউরোফিজিওলজিস্টদের মধ্যে প্রবল বিতর্ক ছিল। তখন প্রধানত দুটি থিওরি প্রচলিত ছিল:
Relative Inhibition: এই থিওরি অনুযায়ী inhibitory সিগন্যাল নিউরনের থ্রেশোল্ডকে কিছুটা বাড়িয়ে দেয়। ফলে নিউরনটি ফায়ার করার জন্য আগের চেয়ে অনেক বেশি এক্সাইটেটরি সিগন্যালের প্রয়োজন হয়।
Absolute Inhibition: এই থিওরি অনুযায়ী inhibitory সিগন্যাল অন্য সব উদ্দীপনাকে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে নিউরনটিকে সরাসরি থামিয়ে দেয় (একটি "Veto" সিগন্যালের মতো)।
ম্যাককালোচ এবং পিটস তাঁদের মডেলে Absolute Inhibition ব্যবহার করেছিলেন। অর্থাৎ একটি ইনহিবিটরি ইনপুট পাওয়া মানেই আউটপুট ০। তবে তাঁরা স্বীকার করেছিলেন যে এটি নিয়ে বিতর্ক আছে। তাঁদের যুক্তি ছিল, গাণিতিক যুক্তির খাতিরে এই পার্থক্যটি আসলে খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ নয়; কারণ এক ধরণের ইনহিবিশন ব্যবহার করে যে ফলাফল পাওয়া যায়, অন্যটি দিয়েও তা গাণিতিকভাবে প্রমাণ করা সম্ভব। তবে সেই গাণিতিক প্রমাণটি আমাদের বর্তমান আলোচনার মূল বিষয়ের সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত নয় বলে আমরা সেদিকে আর বিস্তারিত যাচ্ছি না।
ম্যাককালোচ-পিটস (MCP) নিউরন
বায়োলজির এই পর্যবেক্ষণ থেকেই তাঁরা তাঁদের গাণিতিক মডেলটি দাঁড় করান। বায়োলজিক্যাল ইনপুটগুলোকে তাঁরা দুটি ভাগে ভাগ করলেন:
এক্সাইটেটরি ইনপুট (Excitatory Inputs - \(x_i\)): এগুলো হলো সাধারণ ইনপুট যা নিউরনকে ফায়ার করতে সাহায্য করে। এই ইনপুটগুলো বাইনারি—অর্থাৎ এদের মান হতে পারে ১ (সিগন্যাল আছে) অথবা ০ (সিগন্যাল নেই)।
ইনহিবিটরি ইনপুট (Inhibitory Inputs - \(z_j\)): এগুলো হলো বিশেষ ইনপুট। যদি একটিও ইনহিবিটরি সিগন্যাল থাকে (অর্থাৎ \(z_j=1\)), তবে নিউরনটি আর ফায়ার করবে না।
সামেশন ও থ্রেশোল্ড: সোমার কাজ হলো সব এক্সাইটেটরি ইনপুট যোগ করা (\(\sum x_i\))। যদি এই যোগফল থ্রেশোল্ড, \(\theta\)-এর সমান বা বেশি হয় এবং কোনো ইনহিবিটরি সিগন্যাল না থাকে, কেবল তখনই আউটপুট, $y$ হবে ১।
গাণিতিকভাবে সমীকরণটি এখন দাঁড়ায় এমন:
$$y = \begin{cases} 1 & \text{if} \sum x_i \ge \theta \text{ and all } z_j = 0 \\ 0 & \text{otherwise} \end{cases}$$
ব্লক ডায়াগ্রামে প্রকাশ করলে, তা দেখতে এমন হবে:

ডায়াগ্রামটিতে দেখা যাচ্ছে, এক্সাইটেটরি ইনপুটগুলো \(\sum\) বা যোগফলে জমা হয়। কিন্তু ইনহিবিটরি ইনপুটগুলো সরাসরি লজিক বক্সে গিয়ে 'ভেটো' বা বাধার কাজ করে। লজিক বক্সটি চেক করে: যোগফল থ্রেশোল্ড পার করেছে কি না এবং কোনো ইনহিবিটরি সিগন্যাল নেই কি না। দুটো শর্ত মিললেই কেবল আউটপুট ১ হবে।
লজিক গেট ও মস্তিষ্কের গাণিতিক রূপ
তাঁদের এই মডেলের সৌন্দর্য লুকিয়ে ছিল এর সরলীকরণে। যেহেতু নিউরনের আউটপুট শুধুই ০ বা ১ তাই একে খুব সহজেই বুলিয়ান লজিকের (Boolean Logic) সাথে মেলানো সম্ভব। তাঁরা দেখালেন যে নিউরন ফায়ার করা বা না করার এই ঘটনাটি আসলে লজিক্যাল ‘True’ বা ‘False’ এর মতোই। আর ঠিক এই ধারণার ওপর ভিত্তি করেই তাঁরা প্রমাণ করলেন যে, নিউরনের এই গাণিতিক মডেলটি (Mathematical Model) ব্যবহার করে লজিক গেট তৈরি করা সম্ভব।
এই ধারণাটি প্রমাণ করার জন্য তাঁরা দেখালেন যে শুধুমাত্র থ্রেশোল্ড \(\theta\) এবং ইনপুটের ধরণ পরিবর্তন করে এই কৃত্রিম নিউরন দিয়ে AND, OR, NOT এর মতো বেসিক লজিক গেট তৈরি করা সম্ভব।
চলুন দেখি সেটি কীভাবে কাজ করে:
১. AND Gate তৈরি:
আমরা জানি যে একটি AND গেট তখনই $1$ আউটপুট দেয় যখন তার সবগুলো ইনপুট $1$ হয়। ধরুন আমাদের দুটি এক্সাইটেটরি ইনপুট \(x_1\) এবং \(x_2\)। যদি আমরা থ্রেশোল্ড \(\theta = 2\) সেট করি তবে নিচের ঘটনাগুলো ঘটবে:
ইনপুট (১, ০) হলে যোগফল $1 < 2$ তাই আউটপুট হবে $0$।
ইনপুট (১, ১) হলে যোগফল \(2 \ge 2\) তাই আউটপুট হবে $1$।
অর্থাৎ এটি একটি AND লজিক হিসেবে কাজ করছে।

২. OR Gate তৈরি:
একইভাবে যদি আমরা থ্রেশোল্ড কমিয়ে \(\theta = 1\) সেট করি তবে:
ইনপুট (১, ০) হলে যোগফল \(1 \ge 1\) তাই আউটপুট হবে $1$।
ইনপুট (০, ০) হলে যোগফল $0 < 1$ তাই আউটপুট হবে $0$।
অর্থাৎ যেকোনো একটি ইনপুট $1$ হলেই নিউরনটি ফায়ার করছে যা একটি OR গেটের বৈশিষ্ট্য।

৩. AND NOT Gate তৈরি:
এই গেটটি দেখলে ইনহিবিটরি সিগন্যালের ক্ষমতা আরও পরিষ্কার হবে। এখানে আমরা একটি এক্সাইটেটরি ইনপুট (\(x_1\)) এবং একটি ইনহিবিটরি ইনপুট (\(z_1\)) একসাথে ব্যবহার করব। থ্রেশোল্ড সেট করব \(\theta = 1\)।
যদি \(x_1=1\) এবং \(z_1=0\) হয় তবে আউটপুট হবে $1$। কারণ থ্রেশোল্ড পূর্ণ হয়েছে এবং কোনো বাধা বা ইনহিবিশন নেই।
কিন্তু যদি \(x_1=1\) এবং \(z_1=1\) হয় তবে আউটপুট হবে $0$। কারণ ইনহিবিটরি ইনপুট থাকা মানেই 'ভেটো' বা সরাসরি অফ।
লজিকের ভাষায় একে বলা হয় AND NOT অপারেশন যা প্রমাণ করে যে এই মডেলটি মিশ্র ইনপুটও সামলাতে পারে।

৪. XOR Gate এবং "নেটওয়ার্ক"-এর জন্ম
ব্লগের শুরুতেই যে কভার ফটোটি দেওয়া হয়েছে, সেটি কি খেয়াল করেছেন? সেখানে সবার বামে যে দাড়িওয়ালা ভদ্রলোক দাঁড়িয়ে আছেন, তিনিই হলেন ওয়ারেন ম্যাককালোচ। ভালো করে লক্ষ্য করলে দেখবেন, তিনি বোর্ডের দিকে তাকিয়ে একটি ইকুয়েশন দেখছেন:
$$f = x\bar{y} + \bar{x}y$$
এটি হলো XOR Gate-এর সূত্র। XOR গেট একটু বিশেষ, কারণ এটি আউটপুট ১ দেয় যখন ইনপুট দুটি ভিন্ন হয় (একটি ০, অন্যটি ১)। কিন্তু দুটি ইনপুটই সমান হলে (০,০ বা ১,১) এটি আউটপুট দেয় ০।
সমস্যা হলো, এতক্ষণ আমরা যে AND বা OR গেট বানিয়েছি, সেগুলোর মতো একটি মাত্র MCP নিউরন ব্যবহার করে XOR গেট বানানো গাণিতিকভাবে অসম্ভব।
তাহলে উপায়?
ম্যাককালোচ এবং পিটস দেখালেন যে, একটি নিউরন দিয়ে কাজ না হলে আমরা একাধিক নিউরন ব্যবহার করতে পারি! আমরা যদি আগের তৈরি করা OR গেট, AND গেট এবং AND NOT গেটগুলোকে একে অপরের সাথে জুড়ে দিই, তাহলেই সেই সার্কিটটি XOR-এর কাজ করবে।
এই যে ছোট ছোট নিউরন বা গেটগুলোকে জোড়া লাগিয়ে স্তরে স্তরে সাজানো—এখান থেকেই আসলে "নিউরাল নেটওয়ার্ক" ধারণার সত্যিকারের জন্ম। অর্থাৎ, একক নিউরনের সীমাবদ্ধতা থাকলেও, দলবদ্ধভাবে তারা যেকোনো জটিল লজিক সমাধান করতে পারে।

এভাবেই তাঁরা প্রমাণ করলেন যে আমাদের মস্তিষ্ক আসলে অসংখ্য লজিক্যাল অপারেশনের সমষ্টি। আজকের দিনের কম্পিউটার সায়েন্স বা ডিজিটাল লজিক যে ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে, ১৯৪৩ সালে বসে তাঁরা মস্তিষ্কের ভেতরেও সেই একই গাণিতিক নকশা খুঁজে পেয়েছিলেন।
হাইস্কুল ড্রপআউট পিটস আর অভিজ্ঞ ম্যাককালোচ-ই প্রথম দেখিয়েছিলেন যে, মানুষের মস্তিষ্কের জটিল চিন্তাভাবনাকেও আসলে গণিতের সমীকরণে ফেলা সম্ভব। তবে মনে রাখতে হবে, তাঁদের এই গাণিতিক মডেলটি ছিল সত্যিকারের জীবন্ত নিউরনের একটি অত্যন্ত সরলীকৃত রূপ (Simplification)।
পরের পর্বে যা থাকছে...
আমরা দেখলাম যে এই মডেল দিয়ে লজিক গেট বানানো সম্ভব। কিন্তু সমস্যা হলো আমাদের মস্তিষ্কে প্রায় ৮৬ বিলিয়ন নিউরন আছে। যদি আমরা এই মডেল দিয়ে সত্যিকার অর্থে একটি কৃত্রিম মস্তিষ্ক বানাতে চাই তবে কোটি কোটি নিউরনের থ্রেশোল্ড বা কানেকশন হাতে-কলমে (Manually) সেট করা কি আদৌ সম্ভব? অবশ্যই না।
আমাদের দরকার এমন এক পদ্ধতি যেখানে নিউরন নিজেই নিজের ভুল থেকে শিখতে পারবে এবং প্যারামিটারগুলো অ্যাডজাস্ট করে নেবে। ১৯৫৮ সালে ঠিক এই কাজটিই করেছিলেন ফ্র্যাঙ্ক রোজেনব্ল্যাট। সেই গল্প Perceptron নিয়ে কথা হবে পরের পর্বে।
বিশেষ ধন্যবাদ: Muhammad Mustafiz Billah, লেখাটি রিভিউ করে দেওয়ার জন্য।